বাজে ভাবে ফেঁসে গেছি
রাত তখন দুটো পেরিয়েছে। দুবাইয়ের এক ছোট্ট ঘরের জানালার পাশে বসে প্রদীপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। দূরে উঁচু উঁচু ভবনের আলো ঝলমল করছে, অথচ তার ভেতরটা যেন একেবারে অন্ধকার। টেবিলের উপর খোলা ডায়েরি, পাশে আধখাওয়া এক কাপ চা, আর মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে আছে একটি নাম—ঈশিতা।
প্রদীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের মনেই বলল,
“জীবনটা সত্যিই বাজে ভাবে ফেঁসে গেছে।”
ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ, অথচ গভীর। সে শিক্ষক হবে। গ্রামের
স্কুলে পড়াবে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবে ঘরে ঘরে। তার বিশ্বাস ছিল, শিক্ষাই মানুষের
ভাগ্য বদলাতে পারে। গ্রামের দরিদ্র ছেলেমেয়েরা যাতে তার মতো সংগ্রাম করে বড় হতে পারে,
সেটাই ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
প্রদীপের বাবা ছিলেন একজন ক্ষুদ্র কৃষক। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু মূল্যবোধের
কোনো অভাব ছিল না। বাবা বলতেন,
“মানুষ বড় হয় চরিত্রে, পদে নয়।”
সেই কথাই বুকের মধ্যে ধারণ করে বড় হয়েছিল প্রদীপ। সৎ, পরিশ্রমী, মেধাবী—গ্রামের
সকলের গর্ব ছিল সে। সবাই বলত,
“এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে।”
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।
উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরি মিলল না। একের পর এক পরীক্ষা, ইন্টারভিউ, অপেক্ষা—সবই
যেন এক অন্তহীন দৌড়। যোগ্যতা ছিল, ছিল মেধা, ছিল ইচ্ছাশক্তি। কিন্তু ছিল না ‘সুপারিশ’,
ছিল না অর্থ, ছিল না ক্ষমতার ছায়া।
স্বপ্ন ধীরে ধীরে ভাঙতে লাগল।
যে ছেলে একদিন গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখত, সে আজ নিজের
ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চিত। অবশেষে সংসারের চাপে, মায়ের চোখের জল আর বাবার নীরব অসহায়তা
দেখে, সে প্রবাসে পাড়ি জমাল।
সেই দুবাই।
অনেকেরই স্বপ্নের শহর—কিন্তু প্রদীপের কাছে তা ছিল বাধ্যতার শহর।
দিনে বারো ঘণ্টা কাজ। কখনো গুদামে, কখনো হিসাবের টেবিলে, কখনো ছুটাছুটিতে। ক্লান্ত শরীর,
অবসন্ন মন। রাতে বিছানায় শুয়ে সে ভাবত—এই কি সেই জীবন, যা সে চেয়েছিল?
না !
এ জীবন তার নয়। তবুও বেঁচে থাকার জন্য, পরিবারের জন্য, তাকে এই জীবন মেনে
নিতে হয়েছে।
এই একাকী প্রবাসজীবনেই আবার তার জীবনে ফিরে এল ঈশিতা।
কলেজ জীবনের বন্ধু। একসময় যার চোখের গভীরে সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছিল। দুজনেই
একে অপরকে ভালোবাসত। কিন্তু তখন ক্যারিয়ার, অনিশ্চয়তা, সামাজিক বাধা—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি
নাম পায়নি।
বছরের পর বছর পর একদিন ফেসবুকে হঠাৎ একটি মেসেজ—
“কেমন আছো, প্রদীপ?”
সেই একটি বাক্য যেন মৃত হৃদয়ে প্রাণ ফিরিয়ে দিল।
আবার শুরু হলো কথা। রাত জেগে চ্যাট, ভিডিও কল, স্মৃতির পুনর্জন্ম। দূরত্ব
হাজার মাইল, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব মুহূর্তেই কমে গেল।
ঈশিতা এখনও অবিবাহিতা। পরিবার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। প্রদীপও জানে, তার
জীবনে ঈশিতা ছাড়া আর কেউ নেই।
এক রাতে ঈশিতা বলেছিল,
“তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো?”
প্রদীপ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেছিল,
“ভালোবাসা কি কখনও পুরোনো হয়?”
ঈশিতা কেঁদে ফেলেছিল।
কিন্তু ভালোবাসা থাকলেই কি জীবন সহজ হয়?
প্রদীপের আয় সীমিত। পরিবারের দায়িত্ব বিশাল। ছোট বোনের পড়াশোনা, বাবার
চিকিৎসা, বাড়ির ঋণ—সবকিছুর ভার তার কাঁধে। বিয়ের কথা ভাবলেই সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
ঈশিতা অপেক্ষা করতে চায়। কিন্তু সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।
এর মধ্যেই প্রদীপের জীবনে এল এক অন্ধকার অধ্যায়।
অফিসে তার সহকর্মী নাতাশা—সুন্দরী, আধুনিক, স্বাধীনচেতা। প্রথমে বন্ধুত্ব,
তারপর ঘনিষ্ঠতা। একাকীত্ব মানুষকে দুর্বল করে তোলে। প্রদীপও ব্যতিক্রম ছিল না।
নাতাশার সঙ্গে কাটানো কিছু মুহূর্ত তাকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু
সেই সম্পর্ক ছিল আবেগের, ছিল শূন্যতা পূরণের ব্যর্থ চেষ্টা।
এক রাতে নাতাশা সরাসরি বলল,
“তুমি অতীত আঁকড়ে বেঁচে আছো। জীবনকে উপভোগ করতে শেখো।”
প্রদীপ বুঝতে পারল, সে বিপজ্জনক পথে হাঁটছে। যে মূল্যবোধ নিয়ে সে বড় হয়েছে,
তা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
একদিকে ঈশিতার নির্মল ভালোবাসা, অন্যদিকে একাকীত্বের প্রলোভন।
সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে চিনতে পারছিল না।
অবশেষে একদিন ঈশিতা সব জেনে গেল। নাতাশার সঙ্গে একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায়
দেখে।
ঈশিতা শুধু লিখেছিল—
“আমি তোমাকে হারাইনি, তুমি নিজেকেই হারিয়েছ।”
এই একটি বাক্য প্রদীপের হৃদয়ে বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
সেই রাতে সে প্রথমবার নিজের সামনে দাঁড়াল। নিজের ভুল, নিজের দুর্বলতা,
নিজের নৈতিক পতন—সবকিছুর মুখোমুখি হলো।
সে বুঝল, মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু সেই ভুলকে স্বীকার করে সংশোধন করাই
আসল সাহস।
প্রদীপ নাতাশার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করল। ঈশিতার কাছে ক্ষমা চাইল। কিন্তু
বিশ্বাস একবার ভাঙলে তা জোড়া লাগানো সহজ নয়।
ঈশিতা দীর্ঘদিন কোনো উত্তর দেয়নি।
মাস তিনেক পরে, প্রদীপ দেশে ফিরল। অনেক বছর পর নিজের গ্রামে।
স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখ ভিজে উঠল। এখানেই তো তার স্বপ্নের শুরু।
সেদিন গ্রামের একটি অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রদীপ শিশুদের
সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“জীবনে অনেক সময় আমরা এমন পথে চলে যাই, যা আমাদের গন্তব্য নয়। কিন্তু ভুল পথ বুঝে
ফিরে আসাই আসল জয়।”
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল ঈশিতা।
অনুষ্ঠান শেষে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
দুজনের চোখে হাজারো কথা।
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
“এবার কি সত্যিই ফিরে এলে?”
প্রদীপ বলল,
“হ্যাঁ। এবার নিজেকেও ফিরে পেয়েছি।”
কয়েক মাস পর প্রদীপ গ্রামের একটি কোচিং সেন্টার শুরু করল। স্বপ্নের শিক্ষক
হওয়ার পথ হয়তো সরকারি চাকরির মাধ্যমে আসেনি, কিন্তু সে হার মানেনি।
সে আবার শিক্ষার আলো ছড়াতে শুরু করল।
ঈশিতা তার পাশে দাঁড়াল—সহযাত্রী হয়ে।
তাদের বিয়ে হলো খুব সাধারণভাবে, কিন্তু গভীর ভালোবাসায়।
প্রদীপ বুঝল, জীবনে ফেঁসে যাওয়া মানেই শেষ নয়। কখনও কখনও সেটাই নতুন শুরুর
দরজা।
কারণ স্বপ্ন ভাঙে, মানুষ ভাঙে, সম্পর্কও ভাঙে—কিন্তু যদি সততা, ভালোবাসা
আর সাহস থাকে, তবে জীবন আবার গড়ে ওঠে।
আর সেই গড়ে ওঠার গল্পই সবচেয়ে সুন্দর।
No comments